মতুয়া বিতর্ক

মতুয়া বিতর্ক
সুধীর রঞ্জন হালদার
আজকালফেসবুকনামক সোশাল মিডিয়ায় মতুয়াদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বেশ তর্কবিতর্ক দেখা যায় তার মধ্যে একদল হরিচাঁদ ঠাকুরকে ব্রাহ্মণ্য বর্ণধর্মের বিষ্ণুর অবতার রাম, কৃষ্ণ, গৌরাঙ্গ ইত্যাদির উত্তরসূরি হিসাবে মানেন তাঁরা নিষ্ঠার সাথে বেদ মানেন তাঁরা বুদ্ধের নাম শুনলে ক্ষেপে যান, আম্বেদকরের নাম শুনলে ক্ষেপে যান কেননা, তাঁদের মতে আম্বেদকর নিজধর্ম ত্যাগ করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছেন তাঁরা ব্রাহ্মণ ডেকে ব্রাহ্মণ্য বর্ণধর্মের সমস্ত দেবদেবীর পূজা করেন, কেননা, গুরুচাঁদ ঠাকুর দুর্গাপূজা করেছেন, ভক্তবাড়িতে কালীপূজা করেছেন ইত্যাদি তাঁরা মা-বাবার মৃত্যুতে অশৌচ পালন করে ব্রাহ্মণ দিয়ে তাঁদের পরলোকগত আত্মার উদ্ধারকল্পে তথা স্বর্গে পাঠাবার জন্য শ্রাদ্ধক্রিয়া করেন তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে গয়ায় গিয়ে পিণ্ডও দেন তাঁরা এসব করেন, কারণ, কবিয়াল তারকচন্দ্র সরকার শ্রীশ্রীহরিলীলামৃতে তাই লিখে গেছেন! তাঁরা শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত মানেন, তাই এসব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে শ্রীশ্রীহরিচাঁদের নামে ডঙ্কা বাজিয়ে নিশান উড়িয়েহরিবোলবলে মহোৎসব করে মতুয়াধর্ম রক্ষা করেন
আর একদল আছেন যাঁরা যুক্তিবিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়ে শ্রীশ্রীহরিলীলামৃতে উল্লেখিত তারকচন্দ্র সরকারের কিছু মন্তব্য, হরিচাঁদ ঠাকুর এবং গুরুচাঁদ ঠাকুরের বাণী কর্মকে ভিত্তি করে ব্রাহ্মণ্যবাদ বর্জিত খাঁটি সাম্য, মৈত্রী বিশ্বভ্রাতৃত্বের ধর্ম বলে স্বতন্ত্র ধর্ম হিসাবে মতুয়াধর্ম পালন করেন এবং প্রচার করেন হরিচাঁদ ঠাকুর বুদ্ধের ন্যায়-নৈতিকতাকে ভিত্তি করে মতুয়াধর্ম প্রবর্তন করেছেন বলে উল্লেখ করেন তাঁরা বেদের বিরোধিতা করেন কারণ হরিচাঁদ ঠাকুর বেদ মানতেন না তাঁরা ব্রাহ্মণ্যধর্মের কল্পিত দেবদেবীর পূজা, যজ্ঞ, মৃতের উদ্ধার কল্পে ব্রাহ্মণ ডেকে শ্রাদ্ধক্রিয়া, পিণ্ডদান এসব বর্জন করে খাঁটি মতুয়াধর্ম পালন করার কথা প্রচার করেন
প্রথম দল দ্বিতীয় দলের বিরোধীতা করেন, কারণ তাঁরা নাকি তারকচন্দ্রকে মানেন না, শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত মানেন না তাঁদের বুদ্ধপন্থী, নাস্তিক, বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেন ইত্যাদি বলে গালমন্দ করেন, শাপশাপান্ত করেন; এমনকি নানারকম হুমকি-ধমকিও দিয়ে যাচ্ছেন
দেখা যাচ্ছে দুই দলই তারকচন্দ্রের শ্রীশ্রীহরিলীলামৃতকে ভিত্তি করে মতুয়াধর্মের কথা বলেন পার্থক্য যা তা হল একদল বৈদিক ধর্মের অনুসারী আর একদল অবৈদিক স্বতন্ত্র মতুয়াধর্মের অনুসারী অর্থাৎ দল দুটি পরস্পর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন দুই দলই নিজেদের খাঁটি মতুয়া বলে দাবি করেন এই নিয়ে দুই দলের পরস্পর বিরোধ করা অব্যাহতই রয়েছে
এখন প্রশ্ন হচ্ছে শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত-এর কোন অংশ মতুয়ারা মানবেন, কোন অংশ মানবেন না তাই নিয়ে কেননা, শ্রীশ্রীহরিলীলামৃতেই হরিচাঁদ ঠাকুরের বাণী কর্মের সাথে তারকচন্দ্রের উপস্থাপনায় অসঙ্গতি লক্ষ করা যায় সেক্ষেত্রে একটা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতি আছেই, একথা অস্বীকার করা যায় না অসঙ্গতিপূর্ণ থাকার কারণে সত্যিকার অর্থে সম্পূর্ণভাবে অর্থাৎ অক্ষরে অক্ষরে শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত মানা সম্ভব নয় কথা বোধ হয় অনেকেই ভেবে দেখেননি
এই প্রসঙ্গে প্রথমেই যা বিবেচনায় আনা উচিত তা হচ্ছে, শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত গ্রন্থ রচনা মুদ্রণকালীন সময়ের ঘটনাবলি আমাদের মনে রাখতে হবে ওই গ্রন্থ হরিচাঁদ ঠাকুরের মৃত্যুর প্রায় পঁচিশ বছর পরে তারকচন্দ্র রচনা করেছেন ছাপাও হয়েছে তারকচন্দ্রের মৃত্যুর পরে আবার ধর্মীয় গ্রন্থ ছাপতে হলে তখন যে সমিতির অনুমোদনের প্রয়োজন ছিল তারা নানারকম আপত্তি জানিয়ে রদবদল করতে বলেছিল সেই রদবদলের কাজ করেছিলেন হরিবর সরকারের ভ্রাতুষ্পুত্র যাদব বিশ্বাস এবং হরিবর বিশ্বাস নিজে তাও একবার-দুবার নয়, চারবার তাঁরা সংযোজন, বিয়োজন, সংশোধন করার পরেই ওই গ্রন্থ ছাপা হয় তারপরেও পরবর্তী সংস্করণগুলির প্রায় প্রতিটি সংস্করণেই পরিবর্তন পরিবর্ধন হয়েই চলেছে প্রথম সংস্করণের কপি ব্রিটিশ লাইব্রেরি থেকে উদ্ধার করে দেখা গেছে, তার পৃষ্ঠাসংখ্যা থেকে নবতম সংস্করণে প্রায় খানেক পৃষ্ঠা বেশি অর্থাৎ তারকচন্দ্রের লেখা শ্রীশ্রীহরিলীলামৃত গ্রন্থের কোনটুকু অবিকৃত আছে, তা বোঝার সত্যিকারে কোনো উপায় নেই উল্লেখ্য যে, তারকচন্দ্রের লেখা মূল পাণ্ডুলিপিও নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে তাহলে কোন শ্রীশ্রীহরিলীলামৃতকে মানলে মতুয়া হওয়া যাবে তা বোঝার উপায় কী?
          *             *            *             *            *
আমার এই আলোচনার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে মতুয়াদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি, দলাদলি, ভুলবোঝাবুঝি, পরস্পর বিরোধী অবস্থান, সে সম্পর্কে সমস্ত মতুয়ারাই শ্রীশ্রীহরিলীলামৃতে উল্লেখিত হরিচাঁদ ঠাকুরের বাণী, কর্ম ভক্তদের উদ্দেশে দেওয়া উপদেশ, সেইসঙ্গে গুরুচাঁদ ঠাকুরের কর্ম, বাণী ব্যাখ্যার ভিত্তিতে যুক্তি-বিজ্ঞানের সহায়তায় মতুয়াধর্মের সঠিক দিক্-নির্দেশনা কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে চিন্তাভাবনা করবেন আলোচনার প্রথম পর্যায় ফেসবুকে পোস্ট করার পরে অনেক বন্ধুদের কাছ থেকে বিভিন্ন মতামত, প্রতিক্রিয়া জানতে পেরেছি তাতে আমি খুবই উৎসাহিত বোধ করছি এবং আনন্দ বোধ করছি যে তাঁরা বিষয়ে যথেষ্ট ভাবনাচিন্তা করেন, যদিও কয়েকজন বন্ধু এটাকে ভালো চোখে দেখেননি শুধু যে ভাল চোখে দেখেননি তা নয়, তাঁদের কেউ কেউ নানারকম ব্যঙ্গোক্তি, বক্রোক্তির মাধ্যমে আসল আলোচনার উদ্দেশ্যটাকেই বানচাল করতে চেষ্টা করেছেন এখন হয় তাঁরা যুক্তি-বিজ্ঞান রহিত নিতান্তই গোঁড়া, অন্ধবিশ্বাসী এবং কুসংস্কারাচ্ছন্ন অথবা ধূর্ত প্রকৃতির, অর্থাৎ তাঁদের উদ্দেশ্যই হচ্ছে আলোচনাটাকে বানচাল করে দিয়ে তাঁদের কোনো গোপন স্বার্থ চরিতার্থ করা এছাড়া সুস্থ তর্কবিতর্কের বাইরে ওই ধরণের মন্তব্য উত্থাপিত হওয়ার কোনো কারণ থাকতে পারে না যাই হোক ব্যক্তিগতভাবে তাদের মন্তব্য বা কটূক্তির কোনো জবাব দেওয়া নিষ্প্রয়োজন মনে করি
কেউ কেউ বলেন, আমরা লীলামৃতকে মানি আর কিছু মানি না এবং প্রশ্ন করেন, আপনি লীলামৃতকে মানেন কিনা প্রসঙ্গে আগেই বলেছি, কোন লীলামৃতকে মানবো? একটি সংস্করণ থেকে যদি অন্য সংস্করণগুলি আলাদা আলাদা হয়, তারকচন্দ্রের প্রথম পাণ্ডুলিপিকে যদি কাটাকুটি করে চারবার অন্য লোকদের দ্বারা পরিবর্জন, পরিবর্ধন, সংশোধন করা হয়, ( কথা প্রথম সংস্করণের পরিশিষ্ট অংশেই আছে) তবে মূল জিনিসটি খুঁজে পাবো কী করে? আবার যেসব জায়গায় ঠাকুরের বাণীর সঙ্গে লীলামৃত সাংঘর্ষিক হয়, সেখানে কী করবো? তার চেয়ে পরবর্তী সংস্করণগুলি বাদ দিয়ে প্রথম সংস্করণে তারকচন্দ্রের কবিত্ব ভাবনার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ না করে আমরা ঠাকুরের যে বাণীগুলি পেয়েছি, তাঁর কর্ম উপদেশাবলি পেয়েছি তার উপরই বেশি গুরুত্ব আরোপ করা উচিত নয় কি? সেইসঙ্গে আমাদের আছেশ্রীশ্রীগুরুচাঁদ চরিত’, যাতে আমরা বিস্তারিতভাবে পেয়ে যাই গুরুচাঁদ ঠাকুরের বাণী, কর্ম এবং উপদেশাবলী এই দুই ঠাকুরের বাণী, কর্ম এবং উপদেশের মধ্যেই তো আমরা পেতে পারি মতুয়াধর্মের সমস্ত নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ এবং মতুয়াদের করণীয় এবং না-করণীয় বিষয়গুলি এতে কি আমাদের লীলামৃতকে মানা হবে না বা গুরুচাঁদ চরিতকে মানা হবে না?

অতএব, বক্তব্য দীর্ঘ না করে মতুয়াধর্ম সম্পর্কে চিন্তাশীল বিজ্ঞ ব্যক্তিবর্গকে অনুরোধ করছি, আসুন, বিষয়ে চিন্তাভাবনা করুন এবং আলোচনা সাপেক্ষে মতুয়াদের মধ্যে এই যে দলাদলি, পরস্পর বিরোধী মানসিকতা এর অবসানকল্পে একটা সুনির্দিষ্ট পথের সন্ধান সকলে মিলে বের করার সর্বাত্মক চেষ্টা করুন জয় হরিচাঁদ, জয় গুরুচাঁদ

Comments

  1. খুব ভালো বিষয় তুলে ধরেছেন। প্রত্যেক মতুয়াদের উচিৎ সুস্থ্য ভাবনা চিন্তার দ্বারা হরিচাঁদ ঠাকুর, গুরুচাঁদ ঠাকুরের মূল মহৎ উদ্দেশ্য বোঝা। এ না হলে কেবল গোঁড়ামি দিয়ে বিচার করলে হরিচাঁদ ঠাকুরের উদ্দেশ্য সফল হবে না। আমার মনে হয় ঠাকুরদের বানী এবং কর্মের মধ্যেই অধিকাংশ বিষয়ের স্পষ্টতা রয়েছে।

    ReplyDelete

Post a Comment